যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

ড. নিনা আহমেদ’র অনন্য রেকর্ড

ড. নিনা আহমেদ’র অনন্য রেকর্ড

নিউইয়র্ক প্রতিনিধি: গোটা আমেরিকা জুড়ে চলছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। সেইসাথে টানা ২ সপ্তাহ ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের বিক্ষোভ। আর এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য রচিত হল এক নতুন মাইল ফলক। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রাইমারি নির্বাচনে অডিটর জেনারেল পদে নির্বাচিত হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিনা আহমেদ। আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজ্য পর্যায়ের একটি সম্মানজনক পদে নির্বাচিত হলেন। এ ছাড়া পেনসিলভানিয়া রাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অশ্বেতাঙ্গ এবং নারী অডিটর জেনারেল পদে নির্বাচিত হলেন। ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সব ভোট গণনার পর নিনা আহমেদকে ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। অন্তত ৬০ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকা নিনা আহমেদকে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল ল্যাম্ব অভিনন্দন জানিয়েছেন।ড. নিনা আহমেদ ১০ জুন রাতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ বিজয় আমেরিকায় চলমান বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে জড়িতদের বিজয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন হিসেবে আমি গর্বিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমেরিকায় সদা সরব নিনা আহমেদ বলেন, আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গসহ সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে এ বিজয় এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
করোনার তাণ্ডবে বিপর্যস্ত আমেরিকায় নিনা আহমেদের নির্বাচিত হওয়া মোটেই সহজ ছিল না। পেনসিলভানিয়ায় ডেমোক্রেট দলের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ডেমোক্রেট শ্বেতাঙ্গদের চরম বিরোধিতায় পড়েন তিনি। রাজ্যের অনগ্রসর কমিউনিটির নানা শ্রমিক সংগঠন তাঁকে সমর্থন করে। দলের রাজ্য পর্যায়ের বড় বড় নেতাদের বৈরিতার কারণে দৃশ্যত তাঁর নির্বাচিত হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আসছে নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতার পর রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ অডিটর জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন নিনা আহমেদ। নিনা আহমেদের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমেরিকার ২৩৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশিদের এ অর্জন আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেবে। তিনি জানান, নিনা আহমেদের নির্বাচিত হওয়া কঠিন ছিল। দলের শক্তিশালী পক্ষটি তাঁর বিরোধিতা করেছে। নিনা আহমেদ মুসলমান, গাত্রবর্ণে শ্বেতাঙ্গ নয়। শুধু রাজ্যের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্কের কারণেই তাঁর এ বিজয় সম্ভব হয়েছে বলে জিয়াউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞানী নিনা আহমেদ একজন নারীবাদী ও প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকান। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে তিনি একজন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। নিনা আহমেদ প্রার্থিতা ঘোষণা করে বলেছিলেন, অডিটর জেনারেল হিসেবে নির্বাচিত হলে নিনা সরকারি অফিসে যৌন হয়রানি বন্ধের বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবেন এবং অডিটর জেনারেলের অফিসের ক্ষমতা ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ডেটা ও রিসোর্স সরবরাহ করে এনআরএর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অস্ত্র সুরক্ষা আইন পাস করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। নিনা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, যা নারী ও অন্য বর্ণের মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বোর্ড অব ফিলাডেলফিয়া ফাউন্ডেশনে কর্মরত অন্য বর্ণের অল্প কয়েকজন নারী কর্মীদের মধ্যে শ্রমজীবী ও দরিদ্র পরিবারের মানুষের জন্য নিনা স্থানীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ ডলার সংগ্রহে সহায়তা করেছেন।
এর আগে নিনা আহমেদ ফিলাডেলফিয়া নগরে মেয়র জিম কেনির অধীনে পাবলিক এনগেজমেন্টের ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নারী কমিশন, ব্ল্যাকমেল এনগেজমেন্ট অফিস ও যুব কমিশনের তদারকি করেছেন এবং এলজিবিটি বিষয়ক কার্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি এশীয় আমেরিকান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জবাসীর বিষয়ে বারাক ওবামার উপদেষ্টা কমিশন এবং এশিয়ান আমেরিকানবিষয়ক মেয়র নাটারের কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নিনা ও তাঁর স্বামী আহসান ৩০ বছরের বেশি সময় ফিলাডেলফিয়ায় বসবাস করছেন। তাঁরা দুই কন্যা জোয়া ও প্রিয়াকে তাঁদের কমিউনিটির মূল্যবোধ শিখিয়েছেন।
নিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দেশে বেড়ে ওঠেন এবং ২১ বছর বয়সে আমেরিকায় আসেন। তিনি বলেন, আমেরিকান টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখে দেখেই তাঁর ইংরেজি উচ্চারণে উন্নতি হয়েছিল। তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। পরে আণবিক জীববিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য অর্জন করেন। পেশার বাইরে নিনা একজন সফল নাগরিক নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ফিলাডেলফিয়া ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর উইমেনের সভাপতি হিসেবে অশালীন ই–মেইল প্রেরণকারী তিনজন প্রসিকিউটরকে বরখাস্তের দাবিতে নিনা ফিলাডেলফিয়া জেলা অ্যাটর্নি কার্যালয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।