কামরান নেই, কাঁদছে সিলেট

কামরান নেই, কাঁদছে সিলেট

আবদুল কাদের তাপাদার,সিলেট: মেয়র বা সাবেক মেয়র এটা তার বড় পরিচয় নয়। কামরান ভাই হিসেবে তিনি সিলেট নগরবাসী সকলের কাছে একনামে পরিচিত। রাত বিরাতে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ফোনে কল দিলেও যিনি কোনোদিন বিরক্ত হননি।
ফোন নিজে রিসিভ করতে না পারলে পরক্ষনেই কলব্যাক। যে কোন দরকারে তার বেডরুম পর্যন্ত যেতে পারতো যে কেউ। কারও কোনো সমস্যা জানতে পারলে আগভাগেই তার ফোন অথবা নিজেই বাসায় হাজির। এমনই এক ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে কাঁদছে সিলেট নগরবাসী। কাঁদছে সুরমা পারের মানুষ।
আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতি বা মেয়র হলেও সবাই তাকে নিজেদের আপন ভাবতো। শুধু  সাংবাদিক মহলে কেনো, সবার সাথেই  যেনো বন্ধুত্ব ছিল কামরানের।
এক মধুর অমায়িক ব্যবহারে সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন। সেই মধুর ভালোবাসাকে হার মানিয়ে শেষ বিদায় নিলেন তিনি।
কামরান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে  যোগ দেন সেই সত্তর দশকে। তারপর চলে যান মধ্যপ্রাচ্যে। ফিরে এসে তিনি সিলেট পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৯৫ সালে তিনি আফম কামালকে হারিয়ে কামরান সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে তিনি জোট সরকারের সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় কারাগার থেকে দেড়লাখ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা মেয়র নির্বাচিত হন কামরান।
এটাই তাঁর শেষ মেয়র হওয়া। ২০১৮ সালে  আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। এই ফলাফল খোল নলচে উঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতর।
অভিযোগ উঠে কামরানকে ষড়যন্ত্র করে দলের নেতারা হারিয়েছেন। সিলেটে এসে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাদের সাবধান করে দিয়ে যান।
এরপর নতুন কমিটিতে আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হয় কামরানকে। নতুন চমক সৃষ্টি করে সিলেট আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হন।
কামরান ভাইয়ের সাথে আমার সাংবাদিকতার তিন দশকের অনেক স্মৃতি। ২০০৩ সালে সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনের সময় আমি এবং কবির আহমেদ সোহেল বের করি সাপ্তাহিক দিনরাত এর বিশেষ সংখ্যা।
কিভাবে যে খবর পেয়ে যান কামরান ভাই। আমাকে বাসায় চায়ের দাওয়াত দেন। দিনরাত পত্রিকায় আমরা দুই মেয়র প্রার্থী কামরান আর এম এ হক ভাইকে আলাদা দুটো স্টোরি করি। হাজার হাজার কপি চলে। বিজয়ী হন বাইসাইকেল মার্কার কামরান ভাই। আর পরাজিত হন মাছ মার্কার হক ভাই।
মেয়র কামরান ভাইয়ের কাছে কোনোদিন নিজের জন্য কিছু চাইনি। তবে আমার প্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক জালালাবাদের জন্য বার বার গিয়েছি। কখনো ক্রোড়পত্রের জন্য। কখনো অন্য বিজ্ঞাপনের জন্য।
তিনি অনেককেই বলতেন, আমাকে যে ক’জন সাংবাদিক খুব ভালোবাসেন কাদের ভাই তার একজন। আমি তার জন্য কিছু করতে পারলাম না। আমি যে কোনোদিন কিছু চাই নি। তাই হয়তো এমন ভালোবাসা পেতাম তার। তিনি অনেক বার দৈনিক জালালাবাদে এসেছেন কৃতজ্ঞতা জানাতে। প্রেসক্লাবের ইলেকশনে দাঁড়ালে ফোন করে খোঁজ নিতেন সিরিয়াসলি।

কামরান ভাই গত মার্চ মাসের শেষদিকে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন করোনা পরিস্থিতিতে খোঁজ খবর নিতে। সে সময় তিনি আমি জালালাবাদে নেই কেনো জানতে চেয়েছিলেন। আমি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাইনি। সেদিনের কথোপকথনের কিছু বিষয় আমি ফেইসবুকে শেয়ার করেছিলাম।
কামরান কিন্তু খুব সহজ সরল মানুষ ছিলেন। তার মনের কথা অনেক সময় অবলীলায় বলে দিতেন। আগেকার দিনে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সিলেটের রাজনৈতিক অনেক কঠিন বিষয় সমাধান করে দিতে পারতেন।
কামরান ভাইদের মতো কিছু নেতা থাকার কারণে এক সময় সিলেটের  রাজনীতি ও সমাজে সম্প্রীতির একটা মধুর সম্পর্ক বজায় ছিল যা আজ আর তেমন আশা করা যায় না।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের হয়তো মানুষ হিসেবে, মেয়র হিসেবে অনেক দোষ ত্রুটি ছিল। কিন্তু তার মধুর ব্যবহারের কাছে এটা যেনো হারিয়ে গিয়েছে বার বার। মানুষের ভালোবাসার কাছে সবকিছুই যেনো পরাভূত হয়েছিল বার বার।
তাইতো একজন তৃণমূলের নেতা, মাটি আর মানুষের নেতাকে হারিয়ে সিলেটবাসী কাঁদছে। কাঁদছে আওয়ামী লীগ। কাঁদছে তার প্রতিপক্ষ সকল রাজনৈতিক দলও। কাঁদছে সিলেটের মাটি, সিলেটের মানুষ।
আর কখনো আওয়ামী লীগের মঞ্চে, রাজনীতির মাঠে, প্রশাসনিক বা সামাজিক সভায় দেখা যাবে না কামরানকে। আওয়ামী লীগের কান্ডারী হিসেবে সিলেটে আর কখনো নাম উচ্চারিত হবে না বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের।
বিদায় কামরান ভাই, চিরবিদায়। আপনার যাত্রা এখন অনন্তের পথে। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।