বিদেশে বহুরূপী বাংলাদেশি

বিদেশে বহুরূপী বাংলাদেশি

শফিউল আলম,সুইডেন থেকে:ক’দিন আগে ফেসবুকে একটা রিকোয়েস্ট পেলাম আর্জেন্টিনা থেকে। প্রথমে চমকে গেলাম। একজন বাংলাদেশি, আর্জেন্টিনা থেকে আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠায় কি করে। তার সাথে কথা বলে নিশ্চিত হলাম। সে আমার এলাকার এক পরিচিত ভাই আর্জেন্টিনা প্রবাসী। সত্যিই অবাক হয়েছিলাম অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা কতইনা সহজ করে দিয়েছে।
আজ পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে বাংলাদেশিদের শক্ত অবস্থান। ইংল্যান্ড আমেরিকায় আমাদের অবস্থান সেই বহু আগে থেকে। এছাড়া আফ্রিকাতেও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের। এমনকি পাপুয়া নিউ গিনি আফ্রিকার দেশ যার নাম আমরা অনেকে জানি না, যেখানে মানুষের মাংস মানুষ খায়, সেখানেও বাংলাদেশি ব্যবসা করছে।
ব্রাজিলের খবর আমরা জানি, সেখানেও আমরা আছি। ইংল্যান্ডের এমন কিছু জায়গা আছে, যদি বলি সেখানকার ২য় ভাষা বাংলা, ভুল হবে না। কখনও একবারের জন্যও ইংরেজি বলতে হয়নি লন্ডনের ব্রিকলেনে। ব্রিটিশ এমপি আমাদের, আপনি নরওয়ে যান সেখানেও আমাদের অবস্থান। সেখানের পার্লামেন্ট সদস্য বাংলাদেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্থানের নাম ‘লিটল বাংলাদেশ’। বড় ভালো লাগে আমাদের এত সফলতা দেখে। সফলতার মাঝেও কিছু সমস্যা রয়েই যায়। আমাদের অনেক সমস্যার অন্যতম মনে হয় রাজনীতি। বিদেশে রাজনীতি আমাদের অবস্থান জানান দেয়। আমাদের দাবি আদায়ে এবং এক হয়ে কাজ করতে এক বড় শক্তি রাজনীতি। আমাদের দেশীয় রাজনীতির পাশাপাশি যে যেই দেশে আছে তার স্থানীয় রাজনীতি আমাদের অবস্থানকে শক্ত করে। আবার আমাদের জন্য অবিষাপও বটে।
এখন পর্যন্ত অনেকগুলো দেশ ঘুরলাম। যেখানেই যাই না কেন বাংলাদেশির মানুষের নম্বর নিয়ে যাই। একবার ইন্ডিয়া নেপাল ট্যুর এ গেলাম প্রিয় বন্ধু সোহাগসহ। ইন্ডিয়া থেকে নেপাল ঢোকার পথে এক বাংলাদেশির সাথে পরিচয়। দেখতে বেশ ভদ্রলোক, নাম মমতাজ, বাড়ি ঢাকা দোহার। আমাকে বললেন কোখায় উঠবেন আসেন আমি সাহায্য করি। নিয়ে উঠালেন হোটেলের নাম; ঢাকা হোটেল; তাদের সেবা বেশ ভালো।

মমতাজ আমাকে বিভিন্ন জায়গার বিবরণ দিলেন কোন জায়গায় যেতে খরচ কেমন। বললাম রাতে আসেন। রাতে আর তার দেখা নাই। নিচে খেতে গিয়ে দেখি আরও ৪ বাংলাদেশি। তাদের সাথে পরিচয়। পরে শুনি তাদের দু’জন থেকে ১৫০০ রুপি নিল মমতাজ টিকিট বুকিংয়ের কথা বলে। তার আর দেখা নাই। বুঝতে বাকি রইল না। পরে জানা গেল নতুন কাউকে পেলে সে এভাবেই প্রতারণা করে। তাদের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক হলো।
একসাথে এলাম দার্জিলিং। সেখানে যে হোটেলে উঠি, সেখানে এক বাংলাদেশি কাজ করেন। নাম সিরাজ। বাংলাদেশি শুনে আমাদের যথাসাধ্য আপ্যায়ণ করেন। এই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশি। যেমন মমতাজও আছে তেমনী সিরাজ ভাইয়েরাও বিদেশে আছে। যারা বাংলাদেশি দেখলেই এগিয়ে আসে। বিদেশে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে আপন আরেক বাংলাদেশি।আমরা প্রথম এসে কোনো বাংলাদেশিদের বাসাতেই উঠি। পাকিস্থানী, ভারতীয়সহ হাজার বিদেশির মাঝে সহজে চেনা যায় বাংলাদেশিকে। রাস্তায় কোনো বিপদ বা কোনো তথ্যের প্রয়োজনে বাংলাদেশির সাহায্য সবার আগে মিলে। আবার বাংলাদেশির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর এই বাংলাদেশি। বাটপারি করে আরেক বাংলাদেশির সাথে। বাটপারির নানা ধরণও থাকে। এদের খপ্পরে পড়ে, বাংলাদেশি নিঃস্ব হয়, হারাতে হয় সব।
ইউরোপের বেশ কয়েকটা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। প্রাচীন সভ্যতার দেশ গ্রিস, গ্রিক মিথলজি আমরা জানি। গ্রিসে আছে সক্রেটিসদের বাড়ি। তাই ভাবলাম একবার ঘুরে আসি। সেখানের বাংলাদেশিরা ভালো খারাপ মিলিয়ে আছে। যাদের কিছু করার নাই বা ডকুমেন্ট নাই তারা হয়তো বেঁচে থাকার জন্য ছোটখাট ব্যবসাসহ নানা কিছু করে ।কিন্তু অবাক হলেও সত্য, সেখানে এমন ঘটনাও ঘটল এক বাংলাদেশি আরেক বাংলাদেশিকে জিম্মি করে টাকা দাবি করে। অর্থনৈতিক মন্দা হয়তো আছে। কিন্তু মানুষ এমন কি করে করে। নিজের দেশের মানুষকে জিম্মি করে। আমরা হচ্ছি এই বাংলাদেশি।
পর্তুগাল ভাস্কোডাগামার দেশ। জানালা, তোয়ালে, বালতি এসব পর্তুগিজ শব্দ বাংলা ভাষায় আমরা ব্যবহার করি। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সেখানে ভালো অবস্থানে আছে। সেখানে একটা পদ্ধতি আছে। কেউ যদি ভিসা নিয়ে ওই দেশে যায়, তবে কোনো কাজ দেখিয়ে এবং ৬ মাস ভ্যাট ফ্রি করে, সে ওই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে। ইংল্যান্ড থেকে অনেক স্টুডেন্টকে ভিসা নিয়ে যেতে দেখেছি।
তারা হয়তো মোটামুটি একটা অ্যামাউন্ট ইংল্যান্ড থেকে জমা করে এই দেশে পাড়ি দেয়। আর আমাদের অনেক ব্যবসায়ী ভাই বসে আছে কবে ইংল্যান্ড থেকে কেউ আসবে আর টাকাটা হাতিয়ে নেবে। দোকানে হয়তো কাজ করার রাইট আছে ১-২ জনের। অথচ তিনি ৪-৫ টা কন্টাক্ট মোটা অংকে বিক্রি করে বসে আছেন।
এক্ষত্রে প্রতিটা কন্টাক্ট ২০০০- ২৫০০ দামে বিক্রি করেন । তিনি টাকাটা ঠিকই হাতিয়ে নিলেন। আর নতুন ছেলেটাকে ৬ মাস কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২-৩ বছরও ভ্যাট দিয়েও কাগজ হয় না। কারণ মালিকের অতিরিক্ত কন্টাক্ট বিক্রি যা ভিসা অফিসারের বিশ্বাস হয় না এত ছোট দোকানে কি করে এক লোক কাজ করে। আমরা হচ্ছি বাংলাদেশি। সেখানে বাংলাদেশিরা নানা ধরনের বাটপারি করে। এক এক বাটপারের একেক ধরণ।
এবার ইংল্যান্ডের কথা বলি, সেখানে বাংলাদেশিরা অনেক প্রতিষ্ঠিত। তাদের অবদানে সেখানে বাংলাদেশি সবই পাওয়া যায়, বিদেশে আছি মনে হয় না। তারপরও সমস্যা থেকে যায়। কলেজ ব্যবসার নামে করে জালিয়তি, (যদিও কলেজ ব্যবসা এখন তেমন নেই)। অনেক স্টুডেন্টও এই জালিয়তিতে জড়িয়ে পড়ে। সেখানে সিলেটের মানুষ অনেক। চাকরি, ব্যবসাসহ বেশির ভাগই ক্ষেত্রেই সিলেটের সবাই এগিয়ে। কিন্তু এদের মাঝে সমস্যাও অনেক।

আমরা যারা পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাই আমরা অন্তত দেশে পড়াশোনা করেই যাই, অথচ রেস্টুরেন্টে অনেক অশিক্ষিতরা এমন আচরণ করে যেন তারা পড়তে যায় নাই, আমরা দেশের কামলাদের চেয়েও খারাপ। আপনি যেই অঞ্চলের হোন না কেন, তারা সিলেটের বাইরের সবাইকে ঢাকাইয়া বলেন। এমনও শুনতে হয়েছে আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন না সিলেট থেকে। নিজ দেশ, এলাকার প্রতি মায়া থাকাটা ভালো, তবে অতিরিক্ত আঞ্চলিকতা একজন বাংলাদেশিকে আরেকজন বাংলাদেশির কাছে বিদেশি করে তোলে।
ইংল্যান্ডের পরে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি ইতালিতে বসবাস করে। যখন কোনো দেশে থাকার অনুমতি মেলে না, তখনও ইতালির দরজা খোলা। কিছুদিন পরপর এরা সাধারণ ক্ষমায় সবাইকে থাকার বৈধতা দেয়। এ বৈধতা সময় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় কিছু দালাল চক্র। বাংলাদেশিকে বিশ্বস্ত মনে করে আরেক বাংলাদেশি টাকা জমা দেয় কাজের কন্টাক্ট বাবদ।সরলতার সুযোগে বাংলাদেশি দালালরা টাকা নিয়ে উধাও হয় আবার কাউকে দিব দিচ্ছি বলে ঘোরায়। বলে শেষ করা যাবে না আর ঘটনার অভাব নাই, এত ঘটনা এখানে প্রতিনিয়ত ঘটে। এখানে সবচেয়ে বেশি আছে শরীয়তপুরের লোক। শরীয়তপুরের অনেক লোক ভালো অবস্থানে আছে এটা যেমন সত্য, তেমনী এদের অনেকের টাকা হয়েছে, ঢাকায় বাড়ি করেছে ঠিক কিন্তু এখনও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
ইতালিতে শরীয়তপুরের পর ব্রাম্মণবাড়িয়া, নোয়াখালীর লোক বেশি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেখানে রাস্তায় ব্যবসা করতে গেলেও ওইসব অঞ্চলের না হলে কাউকে ব্যবসা করতে দেয় না। সুবিধা-অসুবিধা, ভালো-খারাপ দুই আছে এবং থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই আমার বন্ধু বান্ধব আছে। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য নয় আমার কাছে যা মনে হয়েছে তা লিখেছি। জানি অনেক ভুল থাকতে পারে। আমার বলার কথা একটাই আমরা যারা বিদেশে আছি, সবাই এক সাথে থাকি, কারো ক্ষতিতে না গিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়াই। আমাদের উন্নয়নে তথা দেশের উন্নয়নে কাজ করি এই প্রত্যাশা।
লেখক- শফিউল আলম, সুইডেন থেকে