করোনার মহামারী প্রভাব

ফ্রান্সে বাংলাদেশিরা চাকরি হারিয়ে বেকার

ফ্রান্সে বাংলাদেশিরা চাকরি হারিয়ে বেকার

কামরুল ইসলাম, ফ্রান্স থেকে: করোনার প্রভাব পড়ছে ফ্রান্সে অভিবাসী বাংলাদেশীদের কাজ-কর্মের উপর। অনেকেই এই মহামারীতে কাজ হারিয়েছে। নিয়মিত বা অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে অনেকেই লকডাউন পরবর্তী সময়ে কাজ পাচ্ছেন না। ফলে তাদের নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।গত ৯ জুন বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা এএফপি সংবাদ প্রকাশ করেছে ব্যাংক অব ফ্রান্সের সূত্র জানিয়েছে, ফ্রান্স সম্ভবত এই বছর “প্রায় এক মিলিয়ন” মানুষ চাকরি হারাবেন। ব্যাংক অব ফ্রান্স জানিয়েছে যে করোনাভাইরাস মহামারী একই সময়ে অর্থনীতির উপরও প্রভাব পড়বে।২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেকারত্ব সম্ভবত ১১.৫ শতাংশ অতিক্রম করবে বলে দাবি করেছে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি। এরই প্রভাব পড়তে শুরু করছে, ফ্রান্সে বসবাসকারী অভিবাসী বাংলাদেশীদের উপর।

বাংলাদেশের বিয়ানীবাজার উপজেলা থেকে  ২০১৭ সালে ফ্রান্সে আসেন আবুল কালাম আজাদ নামের যুবক। তিনি মরক্কো বংশোদ্ভূত এক ফ্রান্স নাগরিকের রেস্টুরেন্টে সেফ হিসেবে কাজ করতেন। কথা হয় তার সাথে, তিনি বলছিলেন, করোনার আগে ভালোই চলছি সব কিছু কিন্তু ফ্রান্স সরকার সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করার পর বাঁধে বিপত্তি। তার রেস্টুরেন্টে মালিক চাইছিলেন, লকডাউনের সময় যেন তিনি কাজ করেন কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি। পরে তাকে ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু লকডাউন পরে যখন তিনি ফিরতে চান কাজে। সেই আরবি মালিক তাকে ব্যবসার মন্দা ভাবের অজুহাতে ফিরতে মানা করেন।
একই এলাকার জুয়েল আহমদ নামের অন্য এক যুবকের কথা হয়। তিনি পিৎজা সেফ হিসেবে বেশ কিছু দিন ধরে একটি দোকানে কাজ করতেন। কিন্তু করোনার পরে লোক বেশি, আয় কম। এই অজু হাতে তারও কাজ চলে যায় বলে জানান।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বাসিন্দা মশিউর রহমান রাজু। তিনি দীর্ঘ আট বছর থেকে ফ্রান্সে আছেন। তিনি বলছিলেন, প্যারিসে এত মানুষ বেকার থাকতে তিনি বিগত দিনে দেখেন নি। তিনি জানান, তার পরিচিত দিদার মেহেদী নামের একজন একটি ফ্রেঞ্চ রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই আলজেরীয় বংশোদ্ভূত মালিক তাকে চাকরি থেকে বের করে দেন।
মোঃ জাবেদুর রহমান নামের অন্য একজন বলেন, কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী শ্রমিকদের এদেশে মালিক পক্ষ ভালো মূল্যায়ণ করেন। এর কারণ হলো, বাংলাদেশীরা নিজেদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, মহামারীর পরিস্থিতিতে মন্দার প্রভাব পড়ছে সব জায়গাতে। ফলে অনেক কর্মীর চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন।

জুনেদ আহমদ নামের একজন বলছিলেন, বাংলাদেশী শ্রমিকরা রেস্তোরাঁ, হোটেল, পিৎজা শপ, উবার ইট ডেলিভারিতে বেশির ভাগেই কাজ করেন৷ মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেলারী কার্ডের যেসকল উবার ইট ডেলিভারি আইডি ছিলো, তাদের অনেকেরই আইডি বন্ধ করে দিচ্ছে উবার৷ এতে বেকার অভিবাসীদের দুঃখ- কষ্টে মাত্র বাড়ছে বৈ কমছে না!
ফ্রান্সে বাংলাদেশ শ্রমিক গ্রুপ (এফবিএসজি) ফ্রান্সে বসবাসকারী অভিবাসীদের বিভিন্ন সহযোগিতা করে থাকে। মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের ভাষাগত সমস্যা, বিভিন্ন আইনি সহযোগীতা করে থাকে। বেকার অভিবাসীদের কাজ খোজেঁ দিতেও তারা চেষ্টা করেন।
কথা হয় শ্রমিক গ্রুপের সেক্রেটারি উবায়দুল্লাহ কয়েছের সাথে, তিনি জানান, পেনডামিকের কারণে বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকেরই কাজ নেই। বিশেষ করে অনিয়মিত অভিবাসীদের দুঃখ-কষ্টে কথা জানালেন আলাদা করে। যাদের বৈধ কাগজ আছে, তারা না হয় কিছুটা হলেও সরকারি সহায়তা পেয়েছেন বা পান। কিন্তু যাদের এখনো কোন কাগজ হয়নি। তাদের চলা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
এ জন্যই সম্প্রতি অনিয়মিতদের নিয়মিত করার দাবিতে ফরাসী সংগঠন মাখশ দু-সলিডারিতের (Marche des solidarité) নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠনগুলো যোগ দেয় বলে জানান তিনি। এই আন্দোলনে বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে দুইজন সমন্বয়ক কমিটির দায়িত্ব পালন করছেন ফরাসি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার এন কে নয়ন ও শ্রমিক গ্রুপের সেক্রেটারি উবায়দুল্লাহ কয়েছ।
এই আন্দোলনে বাংলাদেশী অন্য সেবাপ্রদানকারী সংগঠন অফিওরা, আয়েবা, বাংলাদেশী কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ), ফ্রান্সে বাংলাদেশী কমিউনিটি (এফবিসি), জালালাবাদ এসোসিয়েশন।