সুনামগঞ্জে

ডুবছে গ্রাম বাড়িঘর, ঝুঁকি নিয়ে বসবাস

ডুবছে গ্রাম বাড়িঘর, ঝুঁকি নিয়ে বসবাস

 তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, জামালগঞ্জ থেকেঃ সুনামগঞ্জে গত একমাসে তৃতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ে জেলাবাসীর অবস্থা চরম নাজেহাল হয়ে পড়েছে। বন্যার্তরা ঘরে চৌকির নীচে হাটু পানি অবস্হায় ঝুঁকি নিয়ে কোন রকম বসবাস করছেন। হাওরের বিছিন্ন গ্রামগুলো ডুবুডুবু অবস্থায় রয়েছে।জামালগঞ্জের তিন সন্তানের জননী হাফসিয়া বেগম জানান, তিন দফা বন্যায় দুর্ভোগ পোহালেও আশ্রয়কেন্দ্রে যান নি তিনি। একটি গরু নিয়ে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে তার কাঁচা ঘরেই পানিতে দিন কাটাচ্ছেন।নিজেদের খাবার-দাবার নিজেরাই ব্যবস্থা করে কোন রকম দিন পার করছেন। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারী কোন সঞায়তা পান নি। এজন্য ঘরে কোমর সমান পানি থাকলেও পরিবারের ৩ সদস্য নিয়ে চৌকির উপর চৌকি তুলে ঘরেই আছেন।
আর জারমুনী বন দিয়ে উচু করে কোন রকম একটা গরু বাঁচিয়ে রাখছেন। হাওরের বিছিন্ন পল্লীর গ্রাম উদয়পুরের বাসিন্ধ রেজুয়া আহম্মদ জানান ঢেউয়ের কারনে ঘরের ভেড়া ভেঙে ফেলেছে, ঘরটিও যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে।ফেনারবাঁক গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, আমার ঘরে পানি বাশের খুঁটি নষ্ট হয়ে গেছে রোজি নাই কোন রকম সন্তান ও অন্ত:সত্ব স্ত্রীকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তেলিয়া লামা পাড়ারা এক কৃষক তার তিনটি গরু নিয়ে নতুন পাড়ার এক বাসার দুতলায় আশ্রয় নিয়েছে।
এ আবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন জেলার লাখো মানুষ। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাপিত হচ্ছে বানবাসী মানুষ। জেলায় দীর্ঘস্থানী বন্যায় করনে মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তৃতীয় দফা বন্যায় মানুষের ঘর-বাড়ির, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, গাছপালা, রাস্তা-ঘাট, চাষ করা মাছ বানের পানিতে ভেসে যাওয়াসহ কোটি-কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লাখো মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে ও আত্মীয়-স্বজ্জনদের উঁচু জায়গায় অবস্থান করছেন।শ্রমজীবি মানুষরা বেকার হযে পড়ায় খাদ্যাভাবে চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন। পানি বৃদ্ধির কারনে আতঙ্ক গ্রস্থ হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জবাসী। বিষের করে হাওরে অবস্থানরত বিছিন্ন পল্লী গ্রামের বাসিন্ধারা ঢেউয়ের কারনে রয়েছেন আতঙ্কে। উত্তাল ঢেউয়ের তাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নাজেহাল অবস্তায় রয়েছেন।
গত ২৭ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ছিল বন্যার প্রথম ঢল। এরপর ধীরে ধীরে পানি কিছুটা কমতে থাকে। তবে ১১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আরেক দফা ঢলের কারণে বন্যার পানি বেড়ে যায়।পানি কমতে শুরু হচ্ছিল এরই মধ্যে গত ১৮ জুলাই রাত থেকে আবারো অঝোর বৃষ্টি ঝরার কারণে উজান থেকে আসা পাহাড়ী ঢল চরম আকার ধারণ করেছে।
সুনামগঞ্জ জেলা শহরের আশপাশ এলাকাসহ জেলার ছাতক দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, তাহিরপর বিশ্বম্ভরপুর ,দক্ষিণ সুনামগঞ্জ,দিরাই ও শাল্লা এই সমস্ত উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ-লাখ মানুষ।সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার বেলা তিনটায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলোঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল।
জেলার যাদুকাঁটা নদীর পানি ৬১টি সেন্টিমিটার ও পুরোনো সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১২০ মিলিমিটার। একই সময়ে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ১১৭ মিলিমিটার।উজানে বৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপক পরিমাণে পাহাড়ি ঢল নামছে সুনামগঞ্জে। এতে সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। মানুষজন আবার ছুটছে আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে আছে প্রায় এক মাস ধরে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভা ও ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশাসহ সব ক’টি উপজেলার অধিকাংশ এলাকার রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়ি পানির নীচে তলিয়ে গেছে। মুনাষের বাসাবাড়ি রাস্তাঘাট পানিতে নিমর্জ্জিত হয়ে পড়ায় রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে মানুষজন খাদ্য সংকটে রয়েছেন চরম বিপাকে।জেলা প্রশাসনের বন্যা তথ্য কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ২৩৭ বলা হলেও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।জেলায় বৃহষ্পতিবার বিকাল ৩ টা পর্যন্ত ৩১২ টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাদুর্গতরা আশ্রয় নিলেও তিনদফা বন্যায় পঁচে যাওয়া কাচা ঘরে ঝুঁকি নিয়ে আছেন লাখো পরিবার। দুর্গত এলাকার বাসিন্দরা বলেছেন, আশ্রয়কেন্দ্রের চেয়ে ঝুঁকি নিয়ে নিজের বাড়িতেই আছেন বেশি মানুষ।জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে বর্তমানে ২৯৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৩৯৫টি পরিবার রয়েছে। জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৭২৯টি পরিবার।এ পর্যন্ত বন্যার্ত মানুষের মধ্যে ৮৭০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ৩ হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ২ লাখ টাকার গো-খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে জেলায় রোপা আমন, সবজি ক্ষেত ও পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ও জানা যায়। জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানির তোড়ে সড়ক, স্থাপনা ও নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়কে বাঘমারা থেকে শক্তিয়ারখলা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক বন্যার পানিতে প্লাবিত। জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ ও গজারিয়া এলাকার সড়কে কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর পানি।সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়কে প্রায় এক মাস ধরে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ। বন্যার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো জেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলার সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।