শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী পালিত

কামাল বেঁচে থাকলে সমাজকে কিছু দিতে পারত : প্রধানমন্ত্রী

কামাল বেঁচে থাকলে সমাজকে কিছু দিতে পারত : প্রধানমন্ত্রী

নজরুল ইসলাম,ঢাকা:  ছোটবেলা থেকে শেখ কামাল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করত উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কামাল বেঁচে থাকলে সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারত। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিল সে। খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা, রাজনীতি সব প্রতিভাই ছিল তার মধ্যে। সেই প্রতিভা বিকশিত হয়ে দেশের সব অঙ্গনেই কিন্তু অবদান রাখতে পারত এবং সে রেখেও গেছে ঠিকই।

শহিদ শেখ কামালের ৭১তম জন্মবার্ষিকীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বুধবার দুপুরে শেখ কামাল স্মরণে দোয়া, মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভায় গণভবন থেকে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। ছোট ভাই শেখ কামালসহ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি ও ১৫ আগস্টের নির্মমতার কথা স্মরণ করে বারবার আবেগাপস্নুত হয়ে পড়ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, খুব ছোটবেলা থেকে কামাল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করত। শুধু যে খেলা অঙ্গনে তা না, সাংসারিক কাজেও আমার মায়ের সঙ্গে সব রকমের সহযোগিতা করত। কামাল আমার থেকে দুই বছরের ছোট। কিন্তু তার বুদ্ধি, তার জ্ঞান, তার সবকিছুতে একটা পরিমিতিবোধ ছিল। আমরা পিঠাপিঠি ভাইবোন ছিলাম। একসঙ্গে ওঠাবসা, খেলাধুলা, একসঙ্গে চলাফেরা, ঝগড়াঝাঁটি সবই করতাম। একসঙ্গে সাইকেল চালানো, একসঙ্গে ক্রিকেট খেলা ও ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আমার পুতুল খেলায় ও যেমন আমার সঙ্গে থাকত। ওর সঙ্গে ছোটবেলা থেকে বাকি সব খেলা আমিও খেলতাম। যখন একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম তখন আমাদের মধ্যে অনেক ঝগড়াঝাঁটি মারামারি হতো। তাৎক্ষণিক আবার আমরা ভাইবোন মিশে যেতাম।

পিতা বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের কথা উলেস্নখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কামাল ছোট ছিল। সে আব্বাকে অনেক সময় কাছে পেত না। তখন তো আব্বা সবসময় জেলে থাকত। কামাল তো আব্বাকে আব্বা বলে ডাকারও সুযোগ পায়নি। আমরা একসঙ্গে যখন খেলতাম আমি আব্বা বলে ডাকতাম। ও আমাকে জিজ্ঞেস করত, হাচু আপা তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?তিনি বলেন, নিজের জন্য সে কোনো দিন কিছু চাইত না। ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই

আমি আর রেহানা বাংলাদেশ থেকে জার্মানির উদ্দেশে রওনা হই। তখন বিয়ে হয়েছে, নতুন বউ। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমাদের জন্য কী নিয়ে আসব? কামাল একটা ডায়েরিতে লিখে দিল এডিডাস বুট নিয়ে আসবা আপা পেস্নয়ারদের জন্য। সেই লেখাটা রয়ে গেছে। এ সময় খেলাধুলার প্রতি শেখ কামালের আকর্ষণের কথা উলেস্নখ করেন প্রধানমন্ত্রী।শেখ কামালের সাহসী রাজনৈতিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে বড় বোন শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে তার যেই সাহসী ভূমিকা ছিল তাও উলেস্নখ করার মতো। ছয় দফা দেওয়ার পর থেকে যে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয় এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন জাতির পিতাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় তারপরে দেশে যেভাবে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, গণ অভু্যত্থান হয়েছিল প্রতিটি সংগ্রামে কামালের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে।

শেখ কামালের বহুমুখী প্রতিভার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সে স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে, ঢাকা থিয়েটার যখন হয় সেখানেও তার অবদান ছিল। সে নিজে অভিনয় করত, গান গাইত, সেতার বাজাত। খেলাধুলার মাঠে তার সব থেকে বড় অবদান। ধানমন্ডি এলাকায় ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল না। সে-ই উদ্যোগ নেয়, ওই অঞ্চলের সবাইকে নিয়ে আবাহনী গড়ে তোলে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে এই আবাহনীকে আরো শক্তিশালী করে।

স্মৃতিকাতর হয়ে আবেগাপস্নুত শেখ হাসিনা বলেন, সবই একদিনে হারাব এটা কখনোই আমরা চিন্তাও করতে পারিনি, কল্পনাও করতে পারিনি। যাদের সঙ্গে কাজ করেছে, যাদের সঙ্গে একসঙ্গে ছিল, একজন ওসমানী সাহেবের এডিসি, আরেকজন আর্মি অফিসার সেও একসঙ্গে কাজ করেছে। আর তাদের হাতেই নিহত হতে হলো কামালসহ আমাদের পরিবারের সব সদস্যকে। কী নির্মমভাবে এই হত্যাকান্ড ১৫ আগস্ট ঘটেছে। আপনারা একবার চিন্তা করে দেখেন!

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দেশকে যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন, বেঁচে থাকলে দেশকে অনেকদূর নিয়ে যেতে পারতেন। সারাটা জীবন তিনি দেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন। ত্যাগ স্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি জীবন দিয়ে গেলেন। দেশ শুধু স্বাধীনই করেননি আমার বাবা, তিনি এই সেনাবাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন। যারা সেদিন কামালসহ পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করেছে তাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যারা আমাদের বাড়িতে ভাত-নাশতা খায়নি। আর তারাই যখন সরাসরি কামালের সামনে এসে কামালকে গুলি করে বা জামালকে গুলি করে বা বাড়িতে এভাবে গুলি করল...। আপনারা একটা মৃতু্য হলেই তার বিচার দাবি করেন আমার কাছে, আর আমি কিন্তু বিচার পাইনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর তার দুই মেয়েকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়; বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষা করতে জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। এরপর ২১ বছর পর সরকারে এসে মামলা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা হয়। ওই মেজর জিয়া মেজর থেকে মেজর জেনারেল সেই প্রমোশনটা তো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুই দিয়েছিলেন। আমাদের যেই সামরিক কর্মকর্তারা কোনো দিন মেজরের ওপরে উঠতে পারেননি তারা মেজর জেনারেল হয়েছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হচ্ছে, জেনারেল হচ্ছে। এটা কেন হতে পারল? হতে পারল দেশ স্বাধীন করার ফলেই। যার হাতে গড়া তাকেই হত্যা করে দিলে, ঠিক যেই চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন সেই চেতনাটাই নষ্ট করতে চেয়েছিল। আর কত নির্মমভাবে হত্যা করল।

সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে শেখ হাসিনা বলেন, আলস্নাহর কাছে লাখো শুকরিয়া আদায় করি দেশের জনগণ আমাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলেন। যে কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার পেয়েছিলাম। যারা এদেশের রাষ্ট্রপতিসহ একটি পরিবারকে পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাদের বিচার করার সুযোগ পেয়েছি। আলস্নাহর কাছে এজন্য শুকরিয়া আদায় করছি। না পারলে সারাজীবন জ্বলে পুড়ে মরতাম।প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ হত্যাকান্ডে নিহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এ সময়।