নারীরা শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী অর্জনের মধ্য দিয়েই রয়েছে এর সমাধান

নারীরা শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী অর্জনের মধ্য দিয়েই রয়েছে এর সমাধান

                                                                 সম্পাদকীয়
  
সময়টা প্রযুক্তির। সময়টা আধুনিকও। অতীতের অনেক ধ্যান-ধারণার বৃত্ত ভেঙে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে সমহীমায়। এমন কোনো একটি খাত নেই যেখানে নারী তার যোগ্যতা-দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। কর্মজীবী নারী একাধারে পরিবার ও কর্মক্ষেত্র সামলে যাচ্ছে। এক একজন নারী যেন দশভূজা। তা সত্ত্বেও নারীর মুক্তি মিলছে পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতন থেকে। মনে করা হয়, নারীরা শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী অর্জনের মধ্য দিয়েই রয়েছে এর সমাধান। বাস্তবে তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
শিক্ষায় এগোচ্ছে নারী, দক্ষতায় এগোচ্ছে নারী। কিন্তু পাল্টাচ্ছে না সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। পাল্টাচ্ছে না নারী সম্পর্কে পুরুষের বদ্ধমূল ধারণা। অধিকাংশ পুরুষের দৃষ্টিতে নারী কেবলই ভোগ্যপণ্য। যে কারণে আধুনিক বিশ্ব এখনো নারীর জন্য বিভীষিকাময়। ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএন উইমেন ৪ মার্চ এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশিসংখ্যক মেয়ে শিশু স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলে পড়াশোনা অব্যাহত রাখছে। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও তা মেয়েদের জন্য আরো সমতাভিত্তিক ও কম সহিংস পরিবেশ তৈরিতে সহায়তার ক্ষেত্রে সামান্যই ভূমিকা রেখেছে। এটি একটি লজ্জাজনক সংবাদ। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা যারা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি এ রকম একটি সমাজ তাদের জন্য কাক্সিক্ষত হতে পারে না।
২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের শনাক্ত করা গেছে তাদের ৭০ শতাংশই ছিল নারী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যৌন শোষণের কারণে তারা পাচারের শিকার হয়। বিশ্বব্যাপী ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রতি ২০ জন মেয়ের মধ্যে একজন বা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মেয়ে তাদের জীবনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা নারী ও মেয়ে শিশুরা যত ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তার মধ্যে সবচেয়ে সহিংস রূপগুলোর একটি। ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএন উইমেন তথ্যানুযায়ী শিক্ষা, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এই নেতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করেছে।
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১৯ অনুসারে, বিগত এক মাসে লালনপালনকারীদের দ্বারা যে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি বা আগ্রাসনের মুখোমুখি হওয়া ১-১৪ বছর বয়সী শিশুর হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতেই যে কোনো প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। কিন্তু এর বাইরে অপ্রকাশ্য ঘটনা থাকে বহু। সেসব ধর্তব্যে আনলে পরিস্থিতি যে একেবারেই অনুকূলে নেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনো কিশোরী মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।
অনেক কিশোরী মা অপরিণত বয়সে সন্তানের মা হচ্ছেন। তাদের ঘাড়ে চেপে বসছে সংসার ও সন্তানের বোঝা। সব সামলে জীবনের কোনো আস্বাদ তারা গ্রহণ তো করতেই পারছেই না বরং শিকার হচ্ছে পারিবারিক নির্যাতনের। এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোরী মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। অপরিণত বয়সে তারা মা হচ্ছে। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা জীবনের কোনো স্বাদ উপভোগ করতে পারছে না। বরং শিকার হচ্ছে পারিবারিক নির্যাতনের।
অন্যদিকে এখনো স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি বা অফিসগামী নারী রাস্তাঘাটে অহরহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আলো জলমলে সন্ধ্যায় তাদের জীবনে নেমে আসছে গভীর অন্ধকার।
সুতরাং সময় এসেছে সজাগ হওয়ার। নারীর জন্য বিশ্ব এখনো কেনো সহিংস এর মূলে নজর দিতে হবে। এর জন্য পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে নানামুখি উদ্যোগ নিতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই নারীর জন্য সুন্দর বিশ্ব তৈরি হতে পারে